বিএনপি‘র শত্রু-কারা ও মিত্র কারা জেনেনিন

একটা ফালতু ও রাজনৈতিকভাবে অকার্যকর অনুমান প্রতিদিন আমাদের সামনে হাজির করা হচ্ছে। সেটা হল, আওয়ামী লীগই বিএনপির এক নম্বর শত্রু। অনেকে সুশীলতা বজায় রেখে প্রতিপক্ষ কথাটি ব্যবহার করেন। কিন্তু সেই শুরু থেকে দেখলেও বিষয়টি পরিস্কার যে, আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ বা শত্রু হিসেবে জিয়াউর রহমন বিএনপিকে প্রতিষ্ঠা করেন নি। আওয়ামী লীগ বাকশাল কায়েম করে দেশে যে রাজনৈতিক শূন্যতা ও স্বৈরতন্ত্র জারি করে এবং এর ফলে দেশে যে সংকট তৈরি হয় সেই জায়গা থেকে দেশ গঠনের জন্য নতুন চিন্তা ও তৎপরতা নিয়ে বহুদলীয় রাজনৈতিক সংষ্কৃতি শুরু হয় জিয়াউর রহমানের হাত ধরে আর সেটাই পরিণত হয় বিএনপি নামক দলে। এরই সূত্র ধরে আওয়ামী লীগসহ সব দলই রাজনৈতিক প্রাণ ফিরে পায়। যাক, সেইসব পুরানা কথা। বর্তমানেও দেশের অবস্থা একই। আওয়ামী লীগ চেতনাগতভাবে একটি স্বৈরতান্ত্রিক দল। ফলে ১/১১ রাজনৈতিক বিপর্যয়ের পরে ক্ষমতায় আসার পর থেকে লীগ বর্তমানে একটা ফ্যাসিবাদি শক্তি হিসেবে হাজির হয়েছে। যেটা বলছিলাম, লীগ কোন ভাবেই বিএনপির প্রতিপক্ষ না। কারণ পৃথিবীর অনেক বিখ্যাত তাত্বিকই মনে করেন, ফ্যাসিবাদের কোন রাজনীতি বা মতাদর্শ থাকে না, যা থাকে তা হল একটা দানবীয় সংগঠন। এই সংগঠনের উপর ভর করে সব সত্যকে হত্যা করে নিজের ক্ষমতার সুবিধা মত ফটকা বা ছদ্ম সত্য তৈরি করে তা জনগণের উপর মিডিয়া দিয়ে চাপিয়ে দিয়ে ক্ষমতায় থাকতে হয়। ফলে বিএনপির যেখানে রাজনীতি গঠন করা ও দেশ গঠনের প্রকল্প নেয়াই প্রধান কাজ সেখানে রাজনীতিহীন একটি ক্ষমতা সর্বস্ব দল কোন ভাবেই তার প্রতিদন্দ্বী হতে পারে না।
তাপরেও ছদ্ম শত্রুতা তৈরি করে লীগ যে রাজনৈতিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে তা লীগের ক্যারিশমা নয়, এটা বিএনপির রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক সমস্যার কারণেই সম্ভব হচ্ছে। অনেক বুদ্ধিজিবি দেখবেন একটা কথা বারবার বলেন, লীগের ব্যার্থতায় বিএনপি ক্ষমতায় আসে। তার মানে বিএনপির কোন রাজনীতি নাই? কথাটা কি সত্য? এখন দেখছি বরং বিএনপিও লীগের ছক মোতাবেকই রাজনীতি করছে। নিজের রাজনীতি সুবিধার জন্য বিএনপির সব অক্ষমতা জেনেও লীগ বিএনপির বিরুদ্ধে জেহাদি জোশ বজায় রেখেছে।
রাজনীতিতে শত্রু-মিত্র নির্ধারণ ছাড়া ক্ষমতার প্রশ্ন হাজির করা যায় না। কিন্তু সেই শত্রুকে হতে হয় প্রকৃত অর্থেই শত্রু। না হলে ফ্যাসিবাদই ঠিক করে দেয় বিরোধী অবস্থানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কী হবে। ফ্যাসিবাদকে যদি বুঝতে পারি তাহলে আমরা সবাই এটাতে একমত হব যে, ফ্যাসিবাদের যেহেতু কোন রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নাই তাই যারা আগামীতে নয়া রাজনৈতিক দিশা ও দেশ গঠনের প্রকল্প নিয়ে হাজির হবেন তাদের শত্রু এই দলটির মতাদর্শ না। বরং গোটা দেশের শত্রু হল এই দানবীয় সংগঠন। একটা সাধারণ মানুষ এই দানবীয় সংগঠনের বিরুদ্ধে গেলে এবং সে বিএনপি না করলেও তাকে শায়েস্তা করা হয়। তা হলে আমরা দেখছি রাজনীতি শত্রু-মিত্রতার প্রশ্ন ও সংগঠনের মধ্যে সম্পর্ক যেমন আছে একটা বড় ফারাকও আছে। আমি যেটা বারবার বলি, আওয়ামী লীগের কোন রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নাই যা আছে তা হল বর্তমান। আর এই বর্তমানকে ফ্যাসিবাদি ক্ষমতায় রূপ দেয়ার জন্য সে নিজের ভবিষ্যৎ নিজেই খেয়ে বসে আছে। তা হলে বিএনপির এই অবস্থা কেন? কী সমস্যা হচ্ছে? বিএনপি কীভাবে আসলে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ছকেই আটকে আছে— এই প্রশ্নটাই সংক্ষেপে আলোচনা করে শেষ করব।
তা হলে বিএনপির রাজনৈতিক শত্রু কে? এর সরল উত্তর হল— বিএনপির শত্রু বিএনপি। তার মানে দেখা যাচ্ছে বিএনপিতে আছে হরেক রকম বিএনপি। দলের ভেতরের অবস্থা নিয়ে আমি কিছু বলতে পারব না কারণ, আমি সরাসরি দলটির রাজনৈতিক কোন কর্মকাণ্ডের সাথে যুক্ত নাই। একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সমাজ বিজ্ঞানের ছাত্র জিসেবে যে বিষয়গুলো নজরে পড়েছে তাই বলতে চেষ্টা করব।
একটার পর একটা ইস্যু আসে আর সোশ্যাল মিডিয়াতে শুরু হয় বিরাট তর্কযুদ্ধ। এই তর্কযুদ্ধের রাজনৈতিক ফলাফল শূন্য। কারণ মূলধারার মিডিয়া সবসময়ই ফ্যাসিবাদের যুক্তি উৎপাদন করে চলেছে। তার পরেও যারা অতিরিক্ত সক্রিয়তা দেখায় তাদের পরিণতি— হয় গুম, জেল অথবা দেশ ত্যাগে বাধ্য হতে হয়। তা হলে দেখা যাচ্ছে, তৃণমূল বা সাধারণ কর্মীদের যে বিপ্লবী অবস্থান তার থেকে নেতাদের অবস্থান ভিন্ন।
সমর্থক-কর্মী বনাম কেন্দ্রীয় নেতারা:
বিএনপির প্রতি সাধারণ নেতা-কর্মী ও বিপুল সাধারণ মানুষের একটা আবেগ আছে। এর কারণ যাই হোক। কিন্তু সেই আবেগ যতই র‌্যাডিকেল বা বিপ্লবী রূপে বিএনপিকে চায় মূল নেতৃত্ব ততই তাদের হতাশ করে। সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপির রাজনীতির একটা বড় ক্ষেত্র হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়া। আর এতে জাতীয়তাবাদি চেতনার লোকজন বেশ সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন। কিন্তু সমস্যা হল এরা যে সাংষ্কৃতিক পটভূমিতে বিএনপির পক্ষে সব সময় সোচ্চার তা একটি আওয়ামী লীগ কতৃক তৈরি ছদ্ম বাস্তবতা। চিন্তার দিক থেকে এরা নতুন কোন রাজনৈতিক দর্শন তো দূরের কথা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের স্পিরিটকেও মূলধারায় নিয়ে আসতে পারে নাই। বরং এরা বেশির ভাগ সময়ই লীগের প্রোপাগান্ডার বিরুদ্ধে স্বল্পস্থায়ী কাউন্টার প্রোপাগান্ডাই করতে থাকে। একটার পর একটা ইস্যু আসে আর সোশ্যাল মিডিয়াতে শুরু হয় বিরাট তর্কযুদ্ধ। এই তর্কযুদ্ধের রাজনৈতিক ফলাফল শূন্য। কারণ মূলধারার মিডিয়া সবসময়ই ফ্যাসিবাদের যুক্তি উৎপাদন করে চলেছে। তার পরেও যারা অতিরিক্ত সক্রিয়তা দেখায় তাদের পরিণতি— হয় গুম, জেল অথবা দেশ ত্যাগে বাধ্য হতে হয়। তা হলে দেখা যাচ্ছে, তৃণমূল বা সাধারণ কর্মীদের যে বিপ্লবী অবস্থান তার থেকে নেতাদের অবস্থান ভিন্ন। আর এই ভিন্নতা নিয়ে প্রকাশ্যে যে মতবিরোধ তৈরি হয় তা সোশ্যাল মিডিয়াতে ফ্যাসিবাদি ক্ষমতার ছককে আরও শক্ত ভিত্তি তৈরি করতে সাহায্য করে। সরকার একটার পর একটা ইস্যু নিয়ে তাদের এই বিরোধকে জিইয়ে রেখে দলের ঐক্য প্রচেষ্টাকে কৌতুকে পরিণত করতে সক্ষম হয়েছে এবং হচ্ছে। এই যে ভাবাগেবে ভেসে যাওয়া বিপুল অথচ বিভক্ত জন-সামর্থন -এটাই বিএনপির মিত্র। এই জনসমর্থনকে লম্বা একটা রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্যে নিয়ে আসার জন্য মাঠের তর্ক ও ঘরের তর্কর মধ্যে যে ফরাক তা দলটি করতে ব্যার্থ হচ্ছে। অনেক ইস্যু নিয়েই এরা নিজেদের নিজেরাই জনতার ট্রায়ালে হাজির করে আর ফায়দা নেয় লীগ। অথচ এগুলা দলের কেন্দ্রিয় বিভাগে ঘরেই সমাধান করে মাঠের ঐক্যকে শক্ত করা সম্ভব ছিল। মাঠের ও কেন্দ্রের এই চৈতন্যগত স্পিরিটির যে দূরত্ব এর ফলে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জনপ্রিয় বিপ্লবী ফ্যানাটিক ফেবু তারকা তৈরি হচ্ছে যারা কোন ভাবেই রাজনৈতিক মাঠের হিসেবে দলকে এগিয়ে দিতে পারবে না। পারে না।
ডাকাত চাইছে চোর ধরতে :
শুরু থেকে যদি দেখি, সেই পেট্রোল বোমা হামলা তার পরে সেটা নিয়ে বিশাল প্রচার ও বিএনপিক লোকজনদের গণহারে জেলে নেয়া। তার পরে খালেদা জিয়াকে বন্দি করা, সেটাকে এতিমের টাকা চুরির বিষয় হিসেবে প্রচার। তার পরে বিএনপি নেতার টেলিফোন আলাপ মিডিয়াতে প্রচার। তার পরে বিএনপির জনপ্রিয় কণ্ঠ রুমিন ফারহানার প্লট আবেদন নিয়ে যে রাজনীতি। সব কিছুর মধ্যেই লীগের ছককে বাস্তবায়নের লক্ষ্যেই জেনে বা না জেনে কাজ করেছে বিএনপি ও তার সমর্থক শ্রেণী। আমি বলছিনা বিএনপির নেতাদের সবারই চরিত্র ফুলের মতো পবিত্র। দুর্নীতির ধারে কাছে এরা নাই। কিন্তু এই আমলে তো এইসব কথা বলে লাভ নাই। লীগের কাছে বিএনপির এরা দুধভাত। কিন্তু প্রোপাগান্ডার রাজনীতিতে বিএনপির অবস্থা এমন হয়েছে যে, সাধারণ পাবলিক মনে করছে, লীগ-বিএনপি একই। এরা মূলত রাজনীতিকে নিজেদের অর্থভাগ্য চাঙ্গা করতে ব্যবহার করে। লীগের আমলে লাখ লাখ কোটি টাকা নাই হয়ে গেছে। ব্যাংক, শেয়ার বাজার থেকে শুরু করে দেশের এমন কোন খাত নাই যাতে দুর্নীতি বিস্ময়কর গতি লাভ করে নাই। কিন্তু এরাই আবার বিএনপিকে চোরের দল হিসেবে দাঁড় করাতে সচেষ্ট। কেন এটা সম্ভব হচ্ছে? আর এতে বিএনপির সমর্থক গোষ্ঠীও হাওয়া দিয়ে যাচ্ছেন। যেমন, এতিমের টাকা চুরি। অথচ সেই টাকা আরও বেড়েছে। কিন্তু ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটির জন্য মামলাতে ফাঁসানো সম্ভব হয়েছে। কিন্তু বিএনপির তরফ থেকে জনগণের কাছে বিষয়টি পরিস্কার করা যায়নি। বরং এই মোরাল ব্লেইম গেইমে বিএনপিকে জনপরিসরে ভালোই ফাঁসানো গেছে। রুমিনের প্লট আবেদন বিষয়টিও একই রকম। সরকার যখন এই বিষয়টিকে জনগণের সামনে উদাম করে দেয় সবচেয়ে বেশি বিরোধিতা শুরু হয় দলের সমর্থকদের মধ্যে। অথচ এটা তো লীগের রাজনৈতিক ছকের ধারাবাহিক এ্যাকশনই ছিল। ফলে ডাকাতের তৈরি নৈতিকতা নিয়ে নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করে এরা জনগণের কাছে আরও হাস্যকর হয়ে উঠছে। স্বাভাবিক ভাবেই জনগন মোটাদাগে সাদা-কালো বিভাজনের মতোন করেই ভাবতে অভ্যস্ত। ফলে প্রাইভেট ও পাবিলিক নৈতিকতার রাজনৈতিক প্রভাব ও পেটি বা ছদ্ম নৈতিকতার তাত্ত্বিক সমস্যা আলোচনা করে জনগণকে বুঝানো যাবে না। বরং ডাকাতের চোর খোঁজার মিশনে বিএনপিও সহযোগীর ভূমিকা পালন করছে। ব্যক্তিগতভাবে কে কার প্রতিদন্দ্বী তা এমন সময়ে প্রকটভাবে হাজির হয়। নিজের সুবিধার জন্য দল-রাজনীতি ও ব্যক্তিকে ফ্যাসিবাদের কৌশলের কাছে মনের সুখে এরা বলি দিতে থাকে। অথচ রাজনৈতিক ব্যক্তি কতটা ব্যক্তিগতভাবে স্বচ্ছ হবেন তার নজির দলটির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানই রেখে গেছেন। কিন্তু দলটির বাস্তব নীতিতে সেই আদর্শ অনুসরণ করা হচ্ছে না। বরং যারা বিএনপি নামক পাটাতনকে ব্যবহার করে নিজের ভাগ্যকে চাঙ্গা করতে চায় এরাই দলটির মধ্যে শক্ত অবস্থান তৈরি করে বসে আছে। ফলে এখন যেহেতু ফ্যাসিবাদের নৈতিকতা চলছে তাতে সহজেই এদের অনেককেই চোর বানানো সম্ভব হচ্ছে। বাস্তবে কে কতটা বড় বা ছোট চোর সেই বিতর্ক নিয়ে জনগণের কোন আগ্রহ নাই।
নৈতিকতা থেকে রাজনীতি, না রাজনৈতিকতা থেকে নৈতিকতা:
এই ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে বিএনপি যে ভুলটা করছে তা হল, তারা মনে করছে নৈতিকতা থেকে রাজনীতিতে সুবিধা পাবে। কিন্তু আগেই বলেছি প্রকৃত নৈতিকতাকে হত্যা করে ছদ্ম নৈতিকতা তৈরি করা হয়েছে। ফলে সমাজে যে নীতি চলছে তা ফ্যাসিবাদের নীতি। ফ্যাসিবাদের একটা সামাজিকীকরণ হয়েছে। ফলে আগে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করতে হবে, এরপর প্রকৃত নৈতিকতা কায়েমের সংগ্রাম করতে হবে। যেটা মাওসেতুং ও জিয়াউর রহমান করেছিল। ফলে এতিমের টাকা বা রুমিনের প্লট ইস্যুতে বিদ্যমান কাঠামোতে নৈতিক তর্ক উঠলে আর তার ভিত্তিতে তথাকথিত নীতিপন্থি পজিশন নিলে তা লীগের পক্ষেই যাবে। গেছেও সেটা।
এটাকে আমি এভাবে বলি, প্রকৃত সত্যকে হত্যা করে যখন ফ্যাসিবাদের তৈরিকৃত নকল সত্য বা নীতি সমাজে জারি হয় তখন, এই ছদ্ম নৈতিক অবস্থান কোন রাজনীতি তৈরি করতে পারে না। রাজনীতিকে জয়ী করতে পারে না। রাজনীতি দিয়ে তখন আগে এই ফ্যাসিবাদি রাজনীতির মোকাবেলা করতে হয়। এবং যেই স্পিরিট থেকে এই ফ্যাসিবাদকে মোকাবেলার রাজনীতি তৈরি হয় তাকেই প্রকৃত নৈতিকতা আকারে জীবনে, সমাজে হাজির করতে হয়। যদিও আমরা দেখতে পাচ্ছি সরল চোখে নৈতিক বিষয় সমূহ দ্রুত পপুলার কনসেন্ট তৈরি করে। সেটা হোক যে কোন নৈতিক অবস্থান।
ফ্যাসিবাদ যখন সব নীতির এজেন্ট সেজে বসে থাকে তখন আমরা রাজনৈতিক প্রশ্নকে পাশ কাটিয়ে নৈতিক প্রশ্ন ধরে আগলে তা নিজেদের প্রতিরোধে কোন কাজে আসে না? কারণ সব প্রচারযন্ত্র তাদের দখলে। আগে রাজনৈতিক মোকাবেলার প্রশ্ন। যেটা শুরু থেকেই বিএনপি ফেইল করে বসে আছে। ফলে এখন মোরাল ব্লেইম দিয়ে আরও লীগের এজেন্ডার দিকে রাজনীতিকে ঠেলে দেয়ার বদলে আগে প্রোপাগান্ডা ঠেকাতে হবে বিএনপির লোকদের। এরপর ঘরের মধ্যে তর্ক তুলতে হবে কেন একজন পটেনশিয়াল ভোকাল এমন কাজ করতে পারল? দলের পলিসির ভিতর এটার সুরাহা না হলে কোন কাজের কাজ হবে না।
বিএনপি একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। দল হিসেবে তারা ব্যার্থ হলে এই ক্ষেত্র থেকে নতুন রাজনৈতিক শক্তি আকারে যে কোন দলের জন্ম হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র।
ফলে আমি ব্যক্তিগতভাবে সব কিছুতে নীতি বিরোধী বা নীতির পক্ষের লোক না। আমি দেখি রাজনৈতিকভাবে। সবাই জানি, মোরাল এস পলিটিক্যাল। কিন্তু ফ্যাসিবাদের সময়, পলিটিক্যাল এস মোরাল – এই কৌশলে আগাতে হয়। এটাই বিএনপির অন্যতম সমস্যা। এরাও লীগের মত লোক দেখানো নৈতিকতার জালে আটকে আছে। একটা হল- নিজের জীবনে প্রতিদিন নৈতিকতার প্রয়োগ আর একটা হল- নৈতিকতার বাণিজ্য। ফলে বিএনপিকে ঠিক করতে হবে এই পয়েন্টে সে লীগের চেয়ে আলাদা হবে কি না? লীগ এই যে নৈতিকতা প্রচারের কৌশল নিয়েছে সব নৈতিকতাকে হত্যা করে এর মোকাবেলার জন্য নিজেদের জীবনে প্রকৃত রাজনৈতিক-নৈতিকতা চর্চা করার বিকল্প নাই। এটা শুরু হলে আর প্রচার দিয়ে কাজ হবে না। তখনই গুণগতভাবে লীগ থেকে বিএনপির রাজনীতি আলাদা হতে শুরু করবে। এবং নতুন রাজনীতি তৈরি হলে সেটা নতুন নৈতিকতা তৈরি করতে পারবে। কিন্তু ফ্যাসিবাদের ভিতর থেকে নৈতিক জিকির তুলে রাজনীতি তৈরি করা যাবে না (যেমন পারেনি হেফাজত, জামাত)। অন্তত র‌্যাডিক্যাল না হলে সেই নৈতিকতা দিয়ে রাজনীতি হয় না। কাজেই আগে রাজনৈতিক মোকাবেলার প্রশ্ন। আর এটা করতে হলে দলের ঐক্যটা কোন অবস্থায় আছে এখানে প্রকৃত নৈতিকতার চর্চা হচ্ছে কি না তা দেখতে হবে। এটা না হলে লীগের সাথে ছদ্মযুদ্ধ করলে মাঠের হাজার হাজার ত্যাগী নেতা-কর্মীরা বিপ্লবী জোশে থাকবে কিন্তু মূল নেতৃত্ব থাকবে টেবিল টকে। তখন তৈরি হবে হতাশার বলয়। ফলে বিএনপিকে বুঝতে হবে, বিএনপি একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। দল হিসেবে তারা ব্যার্থ হলে এই ক্ষেত্র থেকে নতুন রাজনৈতিক শক্তি আকারে যে কোন দলের জন্ম হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র।
রাজনীতিতে ফিরতে হলে:
খালেদা জিয়ার ডাকে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি যে আন্দোলন শুরু হয় তা বাস্তবিকভাবে ব্যাপক আকার ধারণ করেছিল। কিন্তু মূল নেতাদের সাথে মাঠের কর্মীদের স্পিরিটের যে গ্যাপ তার সুযোগে পেট্রোল বোমার রাজনীতির ফায়দা নিয়ে স্বৈরতন্ত্র থেকে ফ্যাসিবাদের দিকে যাত্রা শুরু করে লীগ। এর পরে খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখে নির্বাচনে যাওয়া। সেই নির্বাচনে যে পাঁচজনকে জেতানো হল তাদের নানান নাটকের পরে সংসদে পাঠানো। এই সবই যদি লীগের মতো একটি ফ্যাসিবাদি দলের সাথে কৌশলগত সমঝোতায় পৌঁছানোর মাধ্যম হয়ে থাকে সেটা রাজনৈতিকভাবে হতাশাজনক। এর হাত ধরেই এবার সরকার বিএনপিকে নৈতিকভাবে দেউলিয়া দল হিসেবে প্রমাণের ধারাবাহিক এ্যাকশন শুরু করে। এবং মাঠের আবেগে ও নেতাদের কাজের মধ্যে ফারাকও বাড়তে থাকে। তার মানে দলটির রাজনৈতিক পলিসির ভিতর দীর্ঘমেয়াদি কোন কৌশল নির্ধারণ করা ছিল না। হুট করে সংসদে যাওয়া ও অন্যদিকে সংসদের গিয়ে এটাকে অবৈধ বলা। এটা তো গাছের ডালে বসে গাছ কাটার মতো আত্মঘাতী। এর জের হিসেবেই রুমিনের প্রতি জনরোষ। এই নৈতিক পরাজয় দলটির তৃণমূলে ব্যাপক হতাশা তৈরি করেছে।
এখন এটা থেকে উত্তরণের জন্য শুরু থেকে আরম্ভ করা ছাড়া আর কোন উপায় নাই। কথায় বলে, যে খানে ক্ষয় সেখানেই জয় করতে হয়। যেখানে ব্যাথা ঔষধ সেখানেই দিতে হবে। না হলে এই সংসদে যোগদানের সূত্র ধরে বিএনপিকে দিন দিন আরও ভোগান্তি ও নৈতিক ব্লেইম গেমে কাবু করা হবে। ফলে এখন পথ হল, এই অবৈধতাকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলার পথ তৈরি করা। দল-মত সবাইকে নিয়ে ফ্যাসিবাদ বিরোধী ঐক্য তৈরি করা। আর এটা করতে হলে, এই অবৈধ সংসদে যাওয়া, সব সুবিধা নেয়া এইসব হাস্যকর কৌশল বাদ দিয়ে সবাইকে পদত্যাগ করে রাজনৈতিক ময়দানে ফিরতে হবে। তা হলেই কেবল বিএনপি নৈতিকভাবে আগের অবস্থানে ফিরে আসতে পারে। খালেদা জিয়াকে মুক্ত করা আর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন সফল করা -দু’টি তখনই এক হবে যখন বিএনপি নীতিগত ভাবে ফ্যাসিবাদি নৈতিকতার বাইরে গিয়ে বিএনপিকে প্রকৃত অর্থেই একটি গণতন্ত্রের এজেন্ট আকারে হাজির করতে পারবে। এবং তখনই খালেদা জিয়া সর্ব সাধারণের কাছে গণতন্ত্রের প্রতিকে পরিণত হবে। কিন্তু এই খাইখাই ও সেল্ফিবাজি, চটকদার নেতাদের দিয়ে তা হবে না। অন্যদিকে খালেদা জিয়াকে জেলে রেখে জনগণের সহানুভূতি আদায়ের যে কৌশল তা ফ্যাসিবাদের কাছে কোন কাজে আসবে না। খালেদা জিয়াকে এই নৈতিক ব্লেইম গেইমের রাজনীতির শিকারে পরিণত করার জন্য দলটির নেতা-কর্মীরা বড় অংশেই দায়ী। ফলে এখন জনগণ খালেদা জিয়ার জন্য রাস্তায় নামতে পারছে না কারণ তাকে কেন্দ্র করে নৈতিক স্পিরিট জারি হওয়ার কথা ছিল তা ফ্যাসিবাদি প্রোপাগান্ডা ও নিজে দলের বিভক্তির কারণে এবং আসলেই বিএনপি প্রকৃতভাবে রাজনৈতিক নৈতিকতার পথে না ফেরার কারণে তা হচ্ছে না। জনগণ ভাববে লীগ লুট করছে ১৩ বছর ধরে এর পর এরাও তো একই কাজ করবে! কোন রাজনৈতিক উত্তরণের আশা না থাকায় এই বিপুল জনসমর্থন নিয়েও বিএনপি অসহায় হয়ে রয়েছে। অথচ ফ্যাসিবাদকে মোকাবেলার জন্য এতো বড় সংগঠন না হলেও চলে। দুনিয়ার ইতিহাস তাই বলে। আশা করি সংক্ষেপে এই বিষয়টি একটু হলেও বলতে পারলাম।
প্রচণ্ড জুলুমের ভেতরও এখনও যে দলটি টিকে আছে এটাকে সফলতা হিসেবে দেখার আত্মতৃপ্তি বাদ দিয়ে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে, দেশকে একনায়কতান্ত্রিক হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করে বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠনের রাজনীতি করতে হবে, যে রাজনীতি জিয়াউর রহমান শুরু করেছিলেন। এই জন্য নিজের ব্যক্তি জীবনে প্রকৃতভাবে যে স্বচ্ছতা ও নৈতিকতা চর্চা করেছেন তার সংষ্কৃতি চালু করতে পারলে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গঠনের যে স্বপ্ন বাংলাদেশের মানুষ দেখছে তার নেতৃত্ব দেয়ার ঐতিহাসিক সুযোগ বিএনপি পেতে পারে।
অন্যদিকে পারস্পরিক ভোগদখলের সুযোগ পাওয়ার বাসনা থেকে লীগের ও তার দেশি বিদেশি মিত্রের সাথে সমঝোতার যে আশা সেই রাজনীতিহীন পথটি বাদ দিতে হবে। এবং একদল অপেক্ষা করছে খালেদা জিয়ার স্বাভাবিক বিলোপ আর একদল শেখ হাসিনার স্বাভাবিক অবসান চাইছে, এই যে প্রাকৃতিক সমাধানের উপর শকুনের মতো ভরসা রাখা এই রাজনীতি থেকেও বের হতে হবে।
ফ্যাসিবাদ চিরকাল কখনও ক্ষমতায় থাকতে পারে না। এর স্বাভাবিক করুণ পরিণতি হতে বাধ্য। কিন্তু আবার সেই ফ্যাসিবাদি শক্তি আবারও একই গণতন্ত্রের দোহাই দিয়ে ক্ষমতায় আসতে পারে। কাজেই রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা না করে স্বাভাবিক পরিণতির অপেক্ষায় বসে থাকলে কোন লাভ হবে না। রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করতে পারলে এবং দেশকে ফ্যাসিবাদি শাসন থেকে মুক্ত করতে পারলে লীগের পরিণতি হবে এরশাদেরে চেয়ে করুণ। যা স্বাভাবিক বিদায়ে হবে না। রাজনৈতিক বিজয়ের এই সুযোগটি বিএনপি কাজ লাগাতে না পারলে তা হবে সব চেয়ে দুঃখ জনক।
বিএনপি বা কোন দল এটা করতে না পারলেও যে কোন সংঘবদ্ধ বা পরিস্কার করে বললে, জনগণ সেনাবাহিনীর দিকে চেয়ে বসে থাকবে। আর এবার সেনাবাহিনী ক্ষমতা নিলে সেটা হবে প্রকৃতভাবেই লম্বা সময়ের জন্য রাজনৈতিক সংষ্কারের কর্মসূচি। কারণ আগের আমলগুলোর অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এখন শাসন কাঠামো আরও মজবুত করা সম্ভব। আর রাজনৈতিক শক্তির উত্থান না হলে জনগণ সেনাকেই বেস্ট অপশন ভাবতে শুরু করে।
বিএনপি বা কোন দল এটা করতে না পারলেও যে কোন সংঘবদ্ধ বা পরিস্কার করে বললে, জনগণ সেনাবাহিনীর দিকে চেয়ে বসে থাকবে। আর এবার সেনাবাহিনী ক্ষমতা নিলে সেটা হবে প্রকৃতভাবেই লম্বা সময়ের জন্য রাজনৈতিক সংষ্কারের কর্মসূচি। কারণ আগের আমলগুলোর অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এখন শাসন কাঠামো আরও মজবুত করা সম্ভব। আর রাজনৈতিক শক্তির উত্থান না হলে জনগণ সেনাকেই বেস্ট অপশন ভাবতে শুরু করে। এই পারসেপশন ও রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যার্থতার মধ্য দিয়ে ক্ষমতা রাজনৈতিক দলহীন শক্তির কাছে চলে যায়।
কাজেই বিএনপির সামনে এক ঐতিহাসিক সুযোগ। রাজনীতিহীনতাই বিএনপির প্রধান শত্রু। এটা কাটিয়ে উঠতে পারলে দেশের সব ফ্যাসিবাদ বিরোধী শক্তি বিএনপির সাথে ঐক্যবন্ধ হতে বাধ্য হবে। গণতন্ত্র রক্ষার ভ্যানগার্ড হিসেবে কীভাবে রাজনীতি করতে হবে এবং ফ্যাসিবাদ বিরোধী সংগ্রাম শুরু করতে হবে সেইসব কৌশলগত দিক নিয়ে আমি চেষ্টা করব ধারাবাহিকভাবে ‘যা করিতে হইবে’ শিরোনামে কয়েক কিস্তিতে লিখতে। তবে মনে রাখতে হবে— লীগের ফ্যাসিবাদি নকশা বাদ দিয়ে প্রকৃতভাবে রাজনৈতিক-নৈতিক সত্ত্বা হিসেবে নিজেদের সংগঠিত করে বাংলাদেশেকে একনায়ক ও জুলুমবাজ শাসন থেকে মুক্ত করে জনগণের নাগরিক সম্মান ও প্রাতিষ্ঠানিক গোষ্ঠীবাদী, ব্যাক্তিবাদী হুজুগ বাদ দিয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে দেশকে হারানো গৌরব ফিরিয়ে দিতে পারলেই এই সময়ের রাজনৈতিক হক আদায় হবে। তৈরি হবে নতুন ইতিহাস।

Facebook Comments